নানা নাটকীয়তায় অবশেষে চাঁদপুরের মতলব উত্তরে সাত দিনব্যাপী সোলেমান লেংটার মেলার শুরুতেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মেলায় মাদক কেনাবেচা, সেবন ও অশ্লীল নৃত্যের আসর বসানোর অভিযোগ তোলায় মেলার আয়োজন বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
মেলা উদ্বোধনের দিনই ১৭ চৈত্র (৩১ মার্চ) মাদককে কেন্দ্র করে মেলায় দু’পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশের উপর হামলা ও মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়াকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা।
পরে বুধবার (১ এপ্রিল) মাজার প্রাঙ্গনে এসে মেলা বন্ধের ঘোষণা দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি ও অফিসার ইনচার্জ কামরুল হাসান। সন্ধ্যায় মাজার প্রাঙ্গণে মাইকিং করে উপস্থিত ভক্ত, ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের দ্রুত শান্তিপূর্ণভাবে মেলা এলাকা ত্যাগ করার আহ্বান জানান মতলব উত্তর থানার ওসি (তদন্ত) প্রদীপ মন্ডল।
এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে প্রশাসনের কোনরকম অনুমতি ছাড়াই লাখো ভক্তদের পদচারণায় সাদুল্যাপুর ইউনিয়নের বদরপুরে শুরু হয় ১০৭ তম ঐতিহ্যবাহী লেংটার মেলা। চৈত্র মাসের ১৭ তারিখ এলেই প্রখ্যাত দরবেশ শাহ সোলেমান লেংটার মৃত্যু দিবস ঘিরে মাজারজুড়ে চলে ভক্তদের অসংখ্য আয়োজন।
লোকমুখে জানা যায়, জীবদ্দশায় শুধু এক টুকরো কাপড় পড়ে বলে মানুষের কাছে শাহ সোলেমান লেংটা বাবা নামে আধ্যাত্মিক পরিচিতি পান। তার মৃত্যুর পর ভক্তরা এই মাজার প্রতিষ্ঠা করেন। সোলায়মান শাহ্ কাউকে মুরিদ করেননি। তবে যেখানে তিনি ধ্যান করতেন সেই শতবর্ষী বেলগাছটি ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নদী ও স্থলপথে আসা লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীদের বিশাল এক মিলনমেলা হয়ে ওঠে উপজেলার বদরপুর গ্রাম।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, অসখ্য ভক্ত লেংটা বাবার মাজার জিয়ারত করছে, কেউবা নিয়ে এসেছেন মানত করা গরু-ছাগল-মহিষ। মাজারজুড়ে চলে জিগির আশগার ও ঢোল বাদ্য-বাজনা। তবে প্রতিবছরই মেলা ঘিরে গড়ে ওঠা মাদকের আস্তানা নিয়ে সরব হয়ে উঠে সচেতন মহল। আর এসব বিতর্কেই এবারে শুরুর মাত্র দুইদিনেই এই মেলা বন্ধের নির্দেশ দিল প্রশাসন।
পুলিশ জানায়, মেলার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পোশাকধারী অর্ধশত পুলিশ সদস্য এবং সিভিল পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই এখানে কাজ করেছে।
এদিকে, ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, মাজারকেন্দ্রিক ওরশকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে সুফিবাদী চর্চার সঙ্গে সালাফি ও কট্টর ধারার মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকায় প্রতিবছরই এ ধরনের আয়োজন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, বাংলা ১৩২৫ সালের ১৭ চৈত্র শাহ সোলায়মান লেংটার মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এই ওরশ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখো ভক্ত-অনুসারী অংশ নেন।
কথিত আছে, জীবদ্দশায় শুধু এক টুকরো কাপড় পড়তেন এবং আধ্যাত্মিক নানান কার্যকলাপে মানুষের কাছে শাহ সোলায়মান লেংটা বাবা নামে পরিচিতি পান।
শাহ্ সোলায়মান লেংটার জন্মস্থান কুমিল্লা জেলার বর্তমান মেঘনা থানার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম আলা বঙ্গ ভূঁইয়া। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মতলবের বদরপুরের এ বেলতলীর তার বোনের বাড়ীতে। সেখানে থেকে নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী গ্রামে তিনি বিয়ে করেন। অনেকেই দাবী করেন, তার বংশধর এখনও আছে।
প্রতিবছর অগণিত ভক্ত এ ল্যাংটা মেলার আয়োজন করে থাকে। বাংলা ১৩২৫ সালের ১৭ চৈত্র সোলেমান শাহ বেলতলীর বদরপুর তার বোনের বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৮ চৈত্র তাকে বদপুরের এই বেলতলীতে (যেখানে মাজার) সেখানে তাকে দাফন করা হয়।