একটা সময় দেশের মফস্বল শহরেও সিনেমাপ্রেমী দর্শকের হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকত পুরো সিনেমাপাড়া। সময়ের কাঁটা হিসেব করে দিনরাত চলত একের পর এক শো। দর্শকের চাপ সামলাতে হলের সামনে সাইনবোর্ডে টানানো হতো হাউসফুল। এ জন্যই নব্বইয়ের দশক ছিল বাংলা সিনেমার সোনালি যুগ। তবে সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে সিনেমার কদর এবং সিনেমা হলের যৌবন-জৌলুস।
চাঁদপুরের ৮টি সিনেমা হলের মধ্যে বর্তমানে জেলায় একমাত্র সিনেমা হল হিসেবে তালিকায় রয়েছে মতলব দক্ষিণ উপজেলার এক সময়ের জনপ্রিয় ‘কাজলী’ সিনেমা হলটি। বাকি সবগুলোই গত ১ দশক সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক সিনেমা হলের অস্তিত্বও নেই।
দর্শক সংকটের কারণে একে একে সিনেমা হলগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। ক্যাবল নেটওয়ার্কের পর ইউটিউব ও ফেসবুকের ফলে সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন মানুষ। নব্বই দশকের শেষ দিকে অশ্লীলতা, নকল আর পাইরেসি দর্শকদের সিনেমা হল ছাড়তে বাধ্য করে। সিনেমা হল না থাকায় বর্তমানে বিনোদনের জন্য তরুণ-প্রজন্ম মোবাইল ফোন নির্ভর হয়ে পড়েছে।
একসময় ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই ছবির নাম জানিয়ে মাইকিং করা হতো গ্রামগঞ্জে। ঈদের দিনসহ পরের কয়েক দিন ব্ল্যাকে ছাড়া টিকিট পাওয়া যেত না। ছবি দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শক ভিড় করত। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পরিবার নিয়ে আসত অনেকে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলার রাজমহল ও কাজলী সিনেমা হলে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ হাজার দর্শক বিনোদনের সুবিধা পেত। বর্তমানে দর্শকখরার কারণে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা ‘কাজলী’ হলটিরও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বছরের পর বছর লোকসান গুনছে মালিকপক্ষ। যেকোনো সময় এটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় দুই শিক্ষার্থী জানান, ‘কয়েক বছর আগেও রাজমহল সিনেমাহল জমজমাট ছিল। আমরাও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছবি দেখেছি। কিন্তু লোকসানের মুখে থাকায় হল বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।’
কাজলী সিনেমা হলের নিয়মিত একজন দর্শক জানান, ‘হলে গিয়ে ছবি দেখা আমার শখ। জেলার মোট আটটি সিনেমা হলেই আমি ছবি দেখেছি। কিন্তু গত ১০ বছরে একবারও হলে যাইনি। ভালো ছবির পাশাপাশি সিনেমা হলের পরিবেশ ভালো হলে মানুষ হলমুখী হবে।’
বন্ধ হয়ে যাওয়া একাধিক সিনেমা হলের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁদপুর জেলার চিত্রলেখা ও ছায়াবাণী হলই ছিল জেলার দর্শকদের পছন্দের তালিকায়। এসব হলে প্রতি শোতে ৪০০-৫০০ টিকিট বিক্রি হতো। অন্য সিনেমা হলগুলোতে দর্শকসমাগম কিছুটা কম হতো। তবে সেগুলোতেও প্রতি শোতে যথেষ্ট দর্শকের সমাগম ঘটত। মতলব দক্ষিণ উপজেলার দুটি সিনেমা হলে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ হাজার দর্শক বিনোদনের সুবিধা পেত।
জানা গেছে, ২০১৫ সালে মতলব দক্ষিণ উপজেলার রাজমহল সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের পাশে রাজমহল সিনেমা হলটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। করোনার আগ পর্যন্ত চালু ছিল জেলা শহরের কোহিনুর সিনেমা হল। গত কয়েক বছর লোকসান হলেও কর্মচারীদের কথা মাথায় রেখে মালিকপক্ষ এটি চালু রাখে। কিন্তু করোনায় হল বন্ধ হলে তাঁরা অন্য পেশায় চলে যান।
কাজলী সিনেমা হলে দর্শক সংখ্যা একেবারেই কম।নিয়মিত দর্শক না থাকায় আসন ধুলোয় ঢাকা পড়েছে। কিছু আসন ভেঙে গেলেও সংস্কার করা হয়নি দীর্ঘদিন ধরে।
কাজলী সিনেমা হলের মালিকপক্ষ জানায়, ‘একটা আবেগের কারণে এখন সিনেমা হল চালাই। প্রতি মাসেই লোকসান হয়। অন্য ব্যবসা এরই মধ্যে শুরু করেছি। একটা সময় তো ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘রূপবান’-এর মতো সিনেমা দেখতে দর্শকদের ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হতো। ভালো ছবিগুলো দুই-তিন মাস চালানোর পরও দর্শকের কমতি ছিল না।
হলের কতৃপক্ষ জানায়, ‘কাজলীতে একসময় চারটি শো চালানো হতো। দর্শক না থাকায় এখন দু-তিনটি চালানো হয়। হলটিতে ১০০ টাকা করে আটটি ভিআইপি সিট, ৮০ টাকা করে ২০ জনের কেবিন, ৭০ টাকা করে ৬০ জনের বেলকনি ও ৬০ টাকা করে ৮০ জনের প্রথম শ্রেণির আসন রয়েছে। গত কয়েক বছর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির টিকিট বিক্রি বন্ধ রয়েছে।’
হলের ক্যাশিয়ার জানান, ‘২৫ বছর আগে কাজলী হলে আচার ও চকলেট বিক্রি করতাম। এ দিয়ে সংসার চলত। বিশ্বস্ত হওয়ায় মালিকপক্ষ আমাকে নিয়োগ দেয়। দর্শক না থাকায় এখন হলের ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থেকেও সংসার চালানো যাচ্ছে না। আগে কাজলী হলে টিকিটের দাম ছিল ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ টাকা। তখন টিকিট কেনার দর্শকদের লম্বা লাইনের কথা এখনো মনে পড়ে।’
চাঁদপুর জেলা কালচারাল অফিসার আয়াজ মাবুদ বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য চাঁদপুর উর্বর স্থান। এখানে সিনেমা হলের সংস্কৃতি বিলুপ্তির বিষয়টি অপ্রত্যাশিত। সরকার এই শিল্পকে রক্ষা ও ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিলে আমরা সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা করব। সরকার এই খাতকে গণমুখী করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আধুনিক হল নির্মাণ ও সংস্কারে কেউ এগিয়ে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।