প্রকাশের তারিখঃ ৩০ মার্চ, ২০২৬ | প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩১ অপরাহ্ণ

১০৭ বছর ধরে যেভাবে শুরু হলো ঐতিহ্যবাহী লেংটার মেলা

প্রতিবেদকঃ ডেস্ক রিপোর্ট

হযরত শাহ্ সোলেমান লেংটা বাবা (রহ.) ১২৩০ বঙ্গাব্দে কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আলা বক্স ভূঁইয়া এবং মাতা গুলজান বিবি। তার একমাত্র বোন ছিলেন ফুলজান বিবি।

শৈশবেই পিতা-মাতার মৃত্যু হলে তিনি বোনের স্নেহে বড় হন। তবে ভগ্নিপতির আচরণে অভিমান করে একসময় তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। দীর্ঘ ৩৬ বছর নিখোঁজ থাকার পর হঠাৎ আবার বোনের বাড়িতে ফিরে আসেন। বোন আগে থেকেই নিয়ত করেছিলেন, ভাই ফিরে এলে তাকে দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ঘরে তুলবেন। সেই অনুযায়ী দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে তাকে গ্রহণ করা হয়। আজও প্রতি বছর চৈত্র মাসের ২৩ তারিখে তার মাজারে দুধ দিয়ে গোসলের প্রথা চালু রয়েছে।

আধ্যাত্মিক জীবন ও লেংটা পরিচয়

কিছুদিন নৌকার মাঝি হিসেবে কাজ করার সময় তিনি আধ্যাত্মিকভাবে অনুপ্রাণিত হন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় জীবনযাপন শুরু করেন। কেউ পোশাক পরতে বললে তিনি বলতেন, পোশাক পরলে তার শরীর জ্বলে যায়। কোমরে মাঝে মাঝে একটি লাল গামছা ছাড়া আর কিছু পরিধান করতেন না। এভাবেই তিনি “লেংটা বাবা” নামে পরিচিতি পান।

পীরের সাথে সাক্ষাৎ

তৎকালীন সময়ে ভারতের জৌনপুর থেকে আগত পীর হযরত মাওলানা আব্দুর রব জৌনপুরী সিদ্দিকী (রহ.) চাঁদপুরের বেলতলি এলাকায় আসেন। স্থানীয়দের অভিযোগে লেংটা বাবাকে তার কাছে আনা হলে, সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি পরিপাটি পোশাকে উপস্থিত হন। পরে তিনি বলেন—“তোমরা কেউ মানুষ না, তাই তোমাদের সামনে কাপড় পরি না; উনি মানুষ, তাই তার সামনে কাপড় পরে গিয়েছি।”

কারামত ও অলৌকিক ঘটনা

লেংটা বাবাকে ঘিরে বহু কারামতের কথা লোকমুখে প্রচলিত আছে। যেমন কেউ নামাজ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ইশারায় কাবা শরীফ দেখিয়ে অজু করার দৃশ্য দেখিয়েছেন বলে বর্ণনা আছে। এক ইমামের মনের কথা বলে দিয়ে তাকে সতর্ক করেছিলেন। তার স্পর্শে ফসলের জমিতে ভালো ফলন হতো বলে বিশ্বাস করা হয়। পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ঘটনাও প্রচলিত। ট্রেন থামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ভক্তদের মাঝে আলোচিত।

দই-মিষ্টির ঘটনা

তার একটি বিশেষ অভ্যাস ছিল, দই ও মিষ্টি তৈরি করে লুকিয়ে রাখা এবং সতর্ক করে বলা, কেউ যেন তা না খায়। বিশ্বাস করা হয়, একজন ব্যক্তি তা অমান্য করে খাওয়ার পর মানসিক ভারসাম্য হারান। এ ঘটনা লোকমুখে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ভক্ত ও অনুসারী

তার একনিষ্ঠ ভক্তদের মধ্যে চরণদাসী রউফজান বিবির নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি সর্বদা বাবার সঙ্গে থাকতেন এবং পরবর্তীতে তাকেও আউলিয়া হিসেবে সম্মান করা হয়। তার মাজারও লেংটা বাবার মাজারের পাশেই অবস্থিত।

মৃত্যু ও মাজার

সোলেমান শাহ লেংটা বাবা চাঁদপুরের বদরপুর গ্রামে ১৭ চৈত্র ১৩২৫ বঙ্গাব্দে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয় এবং মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রতি বছর ৭ দিনব্যাপী ওরশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দেশ-বিদেশ থেকে লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

লোকমতে, তার মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, তার ইন্তেকালের সময় বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখা যাবে। ভক্তদের বিশ্বাস, তার মৃত্যুর সময় প্রকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছিল এবং এখনো তার ওরশের সময় বৃষ্টিপাত হয়।

হযরত শাহ্ সোলেমান লেংটা বাবা (রহ.)-কে ঘিরে প্রচলিত ঘটনাগুলো ভক্তদের কাছে আধ্যাত্মিক সত্য, আবার অনেকে এগুলোকে লোককথা হিসেবেও দেখেন। তবে নিঃসন্দেহে তিনি এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সংগ্রহ ও সংকলন- মূর্শেদুল মেরাজ