মতলব উত্তরে এতিমের চাল হরিলুট, ২৫ টনের বেশি গায়েব!

126 Views

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এতিমখানার জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৪৬টি এতিমখানার জন্য বরাদ্দকৃত ৪৬ মেট্রিক টন চালের মধ্যে ২৫ টনেরও বেশি চাল আত্মসাতের অভিযোগে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে এতিমখানা কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয়দের মধ্যে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানা পরিদর্শনে দেখা যায়, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের এক টন (১ হাজার কেজি) চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই পেয়েছে তার অর্ধেক বা তারও কম। কোথাও আবার চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার কলাকান্দি ইউনিয়নের নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রাঃ) নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, এক টন চালের বাজারমূল্য ৫০ হাজার টাকারও বেশি হলেও তারা পেয়েছেন মাত্র ১৫ হাজার টাকা। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে। এসব প্রতিষ্ঠানেও ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্য মিলেছে।

অন্যদিকে জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ষাটনল হাফেজ আব্দুল লতিফ দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, দশানী আল-আমিন আকরামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মুদাফর রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মাথাভাঙ্গা মিলারচর মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং পাঁচআনী আমিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানা যায়, এক টনের পরিবর্তে তারা পেয়েছেন মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কিছু স্থানে এতিমখানার নামে নতুন ডিজিটাল সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও সেখানে এতিম শিশুদের বসবাস বা নিয়মিত পাঠদানের কোনো দৃশ্যমান আলামত পাওয়া যায়নি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও সরকারি বরাদ্দের তালিকায় এক টন করে চাল পেয়েছে।

এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত চালের বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবী ও বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে উদার মনের মানুষ। তিনি সরাসরি এ ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকতে পারেন বলে তারা বিশ্বাস করেন না। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনো প্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে এ অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।

তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) অফিস, প্রকৌশল বিভাগসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এমন ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে বলেও তারা মনে করেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারিভাবে বিতরণ করা চালের বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। সে হিসাবে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ মেট্রিক টন চালের মূল্য দাঁড়ায় আনুমানিক ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা, যা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার বলেন, “সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী আমাদের এক টন চাল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬০০ কেজি। এতিমদের প্রাপ্য চাল আত্মসাতের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাইনি।”

এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, “খাদ্য গুদাম থেকে কখনো আমি নিজে, আবার কখনো অফিসের স্টাফদের মাধ্যমে এতিমখানার প্রতিনিধিদের কাছে চাল হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে চাল কম দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।”

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, “তালিকাভুক্ত প্রতিটি এতিমখানার নামে এক টন করে চালের ডিও (বরাদ্দপত্র) ইস্যু করা হয়েছে।বরাদ্দসংক্রান্ত সব কাগজপত্র আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। বরাদ্দ দেওয়ার পর বাইরে কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকলে তা আমাদের জানা নেই।”

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, “এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও সুযোগ নেই। বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তা আত্মসাতের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এতিমদের অধিকার নিয়ে কেউ আর অনিয়ম করার সাহস না পায়।

TAGGED:
Share This Article
Leave a Comment
শেয়ার করুন:

শীর্ষ সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!