মতলবের রায়হানের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ‘হোপনিটি’

86 Views

বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপটের সময়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে। ‘হোপনিটি’ নামের এই দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার তরুণ রায়হান সরকার।

ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের বাইরে নিজেদের প্রযুক্তি, কনটেন্ট ও ডিজিটাল সেবা নিয়ে আলাদা একটি পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই ২০১৯ সালে হোপনিটির যাত্রা শুরু হয়। একক উদ্যোগে শুরু হওয়া এই পথচলা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তারের দিকে এগোচ্ছে।

রায়হান সরকারের বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের হালিম সরকারের ছেলে। ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও মতলব সরকারি ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
হোপনিটির উদ্যোক্তা রায়হান সরকারের লক্ষ্য শুধু আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করা নয়।

ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের একই ডিজিটাল পরিবেশে যুক্ত করে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাকে এক প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

‘দ্য পিপলস প্ল্যাটফর্ম’ স্লোগান সামনে রেখে হোপনিটির পাশাপাশি হোপচ্যাট, হোপি শপসহ বিভিন্ন সেবা ও সুবিধাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে।

রায়হান সরকার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু মানুষকে অনলাইনে যুক্ত করা নয়, সেই সংযোগকে বাস্তব জীবনের পরিবর্তনে কাজে লাগানো।”

হোপনিটির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে অ্যান্ড্রয়েড, আইফোন ও ওয়েব এই তিন মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে সাত লাখের বেশি ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারী এতে যুক্ত হয়েছেন বলে উদ্যোক্তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোগ হিসেবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও হোপনিটি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। প্রি-সিড বিনিয়োগের তিন মাসের মধ্যে সিড পর্যায়ের নতুন অর্থায়ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যবহারকারীদের তথ্য ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে হোপনিটিতে একাধিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। দুই ধাপের পরিচয় যাচাই, যন্ত্র অনুমোদনসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সুবিধা ব্যবহারকারীর হিসাব ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কাজ করছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে হোপনিটির কার্যক্রম কেবল সামাজিক যোগাযোগ ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না রায়হান সরকার। প্রযুক্তিকে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

খাদ্য, পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ভাগাভাগি থেকে শুরু করে রক্তের প্রয়োজনের সময় মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ তৈরি এ ধরনের সামাজিক কার্যক্রমেও প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এসব উদ্যোগে যুক্ত হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছেন রায়হান সরকার। তাঁর মতে, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও অনলাইন সেবার বাজারে প্রতিবছর বিপুল অর্থ বিদেশি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলে এই বাজারের একটি অংশ দেশের ভেতরেই রাখা সম্ভব।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় ডিজিটাল সেবা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। এতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।

এ জন্য দেশীয় স্টার্টআপে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব করার আহ্বান জানিয়েছেন রায়হান সরকার। তাঁর মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে বিনিয়োগ, নীতিগত সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা প্রয়োজন।

২০১৯ সালে মতলবের এক তরুণের একক উদ্যোগে শুরু হওয়া হোপনিটির বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি সম্ভাবনার গল্প। বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাজারে একটি দেশীয় প্ল্যাটফর্মের টিকে থাকা সহজ নয়। তারপরও নিজস্ব প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন রায়হান সরকার।

মতলব উত্তর উপজেলার প্রত্যন্ত দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামের তরুণ থেকে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার তাঁর এই যাত্রা স্থানীয় তরুণদের জন্যও তৈরি করেছে নতুন অনুপ্রেরণা। হোপনিটির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করা।

সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে হোপনিটি কতটা এগোতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে মতলবের মাটিতে শুরু হওয়া রায়হান সরকারের এই উদ্যোগ অন্তত একটি বার্তা স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশের তরুণদের হাতেও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরির স্বপ্ন দেখার মতো সক্ষমতা ও সাহস রয়েছে।

TAGGED:
Share This Article
Leave a Comment
শেয়ার করুন:

শীর্ষ সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!