চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্থাপন করা বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিনগুলো এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় আট বছর আগে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এসব মেশিন শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই প্রকল্পের আওতায় বায়োমেট্রিক মেশিন বসানো হয়। প্রতিটি মেশিনের জন্য বিদ্যালয় তহবিল থেকে ২৬ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করা হলেও বাজারে একই ধরনের মেশিনের মূল্য ছিল মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা, এমন তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে মেশিনগুলো আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দেয়ালে ঝুলে থাকলেও সেগুলোর কোনো কার্যকর সংযোগ নেই। যেসব বিদ্যালয়ে শুরুতে ডাটাবেজ সংযোগ ছিল, সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে মেশিনগুলো বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করায় অল্প সময়ের মধ্যেই মেশিনগুলো বিকল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলো পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন—সরকারি অর্থ ব্যয়ে কেনা যন্ত্র যদি জনসেবায় কাজে না লাগে, তবে দায়ভার কে নেবে? শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকলে উন্নয়নের সুফল কীভাবে মিলবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, মেশিন ক্রয় প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাদের মাধ্যমেই নিম্নমানের যন্ত্রপাতি উচ্চমূল্যে সরবরাহ করা হয়, যেখানে ব্যক্তিগত লাভই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। এ সিন্ডিকেটের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও সমর্থন ছিল বলে দাবি করেন তারা।
৯২নং গজরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহ আলম বলেন, “প্রয়োজনীয় সংযোগ না থাকায় মেশিনটি শুরু থেকেই অচল। বাস্তবতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প নেওয়ায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ১০ নম্বর ওটারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশিকুজ্জামান। তিনি বলেন, “পরিকল্পনাহীনভাবে বসানো এই মেশিন শুরু থেকেই অকার্যকর। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা না থাকায় এটি ব্যবহারের কোনো সুযোগই তৈরি হয়নি। বিষয়টি বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, “প্রকল্পটি আমার যোগদানের আগের হলেও বর্তমানে কোনো বিদ্যালয়েই বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন সচল নেই।”
এদিকে, শিক্ষা খাতে এমন ব্যয়বহুল কিন্তু অকার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধ করা যায়।